শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ১২:৪৪ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
৫ মার্চ পর্যন্ত কাতার-দুবাইসহ বিমানের ছয় রুটের সব ফ্লাইট বাতিল অভিনন্দন সম্বলিত বিলবোর্ড-ব্যানার দ্রুত অপসারণের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর ইরানে পাঁচশর বেশি জায়গায় হামলায় নিহত বেড়ে প্রায় ৮০০ ‘বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক ভারত’ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দায়ের করা মামলাগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চীন সফরের আমন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ‘কৃষক কার্ড’ চালু সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা সব বাহিনীর প্রধানদের নিয়ে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে অফিস করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্রুতই সিটি করপোরেশন নির্বাচন দেওয়া হবে: মির্জা ফখরুল চিফ প্রসিকিউটরের পদ হারাচ্ছেন তাজুল ইসলাম, আসতে পারেন যিনি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ড. ইউনূসের অভিনন্দন জামায়াত আমিরকে ড. ইউনূসের অভিনন্দন: ‘দায়িত্বশীল রাজনৈতিক শিষ্টাচারের’ প্রশংসা তারেক রহমানকে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের অভিনন্দন ‘নির্বাচনের পরিবেশ নেই’ এবং ‘নিজের ও কর্মীদের জীবনের শঙ্কা আছে’ দাবি স্বতন্ত্র প্রার্থীর

মোবাইল কোর্ট ও ক্ষমতার ভারসাম্য: স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের উপায় কী?

কাজী মামুনুর রহমান মাহিম
আপডেট : মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬, ৭:৫৪ অপরাহ্ন
কাজী মামুনুর রহমান মাহিম। (ছবি : সংগৃহীত)

ফরাসী দার্শনিক মন্টেস্কু তাঁর বিখ্যাত ‘The Spirit of Laws’ বইয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক দর্শনের অবতারণা করেছিলেন, যা ইতিহাসে ‘Check and Balance’ বা ‘পারস্পরিক ভারসাম্য’ নীতি হিসেবে পরিচিত। তাঁর মূল কথা ছিল— ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে রাষ্ট্রের প্রতিটি বিভাগকে একে অপরের ওপর নজরদারি এবং ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষমতা দিতে হবে। আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশ্বে আইনের শাসনের সৌন্দর্যই হলো ক্ষমতার এমন সুষম বণ্টন, যেখানে কোনো বিভাগই যেন স্বেচ্ছাচারী হওয়ার সুযোগ না পায়।

সাম্প্রতিক সময়ে মাঠপর্যায়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ভিডিওগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে নেত্রকোনার একটি ইউনিয়নে মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকে কেন্দ্র করে ম্যাজিস্ট্রেট ও চেয়ারম্যানের বাগবিতণ্ডা এবং পরবর্তীতে ইউপি চেয়ারম্যানকে সাময়িক বরখাস্তের ঘটনাটি প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতাকে জনসম্মুখে এনেছে। একজন সাংবাদিক, সমাজকর্মী এবং আইন ও নীতি বিশ্লেষক হিসেবে এই ঘটনাটি আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে—আইনের শাসন কি কেবল দণ্ড প্রদানের নাম, নাকি এর পেছনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দায়বদ্ধতাও রয়েছে?

আইনি প্রেক্ষাপট ও সেবার মানসিকতা ‘মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯’ অনুযায়ী একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে তাৎক্ষণিকভাবে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠ হলো, আমাদের আমলাতন্ত্রে অনেক সময় সেবার চেয়ে ‘প্রভুত্বের’ মনোভাব বেশি ফুটে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ঘটনায় দেখা যায়, এক বয়স্ক ব্যবসায়ী জেরা চলাকালীন ম্যাজিস্ট্রেটকে অনুরোধের ছলে ‘হোল্ড অন’ বলায় তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। ‘আপনি আমাকে আদেশ দেন? আমি ম্যাজিস্ট্রেট!’—এমন আচরণ বুঝিয়ে দেয় যে, সরকারি কর্মচারীরা অনেক সময় জনগণের সেবকের পরিবর্তে নিজেদের অধিপতি ভাবতে শুরু করেন। দুনিয়াজুড়ে সরকারি কর্মচারীরা জনগণের সেবার মানসিকতা নিয়ে কাজ করলেও, আমাদের এখানে অনেক সময় তাঁরা ধরে নেন জনগণ হলো তাঁদের অধীনস্থ। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে প্রকৃত জনকল্যাণ নিশ্চিত করা অসম্ভব।

মানবাধিকার ও তথ্যের অধিকার: কুড়িগ্রাম থেকে জামালপুর মাঠপর্যায়ে মোবাইল কোর্টকে ব্যক্তিগত বিরোধ মেটানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করে। আমরা দেখেছি কুড়িগ্রামের সেই আলোচিত ঘটনা, যেখানে নিয়মবহির্ভূতভাবে মধ্যরাতে এক সাংবাদিককে ঘর থেকে তুলে এনে তাৎক্ষণিক সাজা দেওয়া হয়েছিল। এখানে বড় প্রশ্নটি ছিল মানবাধিকারের; যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কাউকে দণ্ডিত করা আইনের শাসনের পরিপন্থী। আবার জামালপুরের ঘটনাটি আরও উদ্বেগের—সেখানে একজন সাংবাদিক এডিপির কিছু প্রকল্পের তথ্যের জন্য ‘তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯’ অনুযায়ী আবেদন করায় তাঁকে মামলার শিকার হতে হয়েছে। অথচ এই আইনের ৪ ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে— “এই আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে কর্তৃপক্ষের নিকট হইতে প্রত্যেক নাগরিকের তথ্য লাভের অধিকার থাকিবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাহাকে তথ্য সরবরাহ করিতে বাধ্য থাকিবে।” তথ্য চাওয়া বা স্বাধীন মতপ্রকাশ যখন প্রশাসনের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন জনকল্যাণ ও স্বচ্ছতা উভয়ই বাধাগ্রস্ত হয়।

গণমাধ্যমের ভূমিকা: পেশাদার সাংবাদিকতা বনাম ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েশন’ প্রকৃত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা তখনই নিশ্চিত হবে, যখন মোবাইল কোর্টে স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিত থাকার অবাধ সুযোগ দেওয়া হবে। বর্তমানে অনেক ম্যাজিস্ট্রেট অভিযানের সময় নিজস্ব ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েটর’ বা ক্যামেরা টিম নিয়ে চলছেন, যা পেশাদার সাংবাদিকতার সাথে এক বড় সংঘাত তৈরি করছে। ম্যাজিস্ট্রেটের নিজস্ব টিম কেবল তাঁর ‘হিরোইজম’ বা সাফল্য প্রচার করে; অনেক সময় অভিযুক্তের দোষ প্রমাণিত হওয়ার আগেই তাঁর ভিডিও ছবি ছড়িয়ে দিয়ে সামাজিকভাবে হেয় করা হয়, যা সুস্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন। অন্যদিকে, একজন পেশাদার সাংবাদিক ঘটনার বস্তুনিষ্ঠ চিত্র এবং আইনি প্রক্রিয়ার ভুলত্রুটিগুলোও সাহসের সাথে তুলে ধরতে পারবেন। অভিযানে স্বাধীন সাংবাদিকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেলে ম্যাজিস্ট্রেট আইন ও পদ্ধতির ব্যাপারে অনেক বেশি সচেতন থাকবেন, যা কোনো প্রকার পদ্ধতিগত ভুল (Procedural errors) ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে একটি শক্তিশালী ‘ঢাল’ হিসেবে কাজ করবে।

ভারসাম্য রক্ষায় জনপ্রতিনিধির গুরুত্ব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। তিনি এলাকার প্রতিটি নাগরিকের অবস্থা সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন। ম্যাজিস্ট্রেট যদি তাঁর দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন, তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে ‘পর্যবেক্ষক’ হিসেবে উপস্থিত রাখলে বিচারিক প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। চেয়ারম্যান এখানে বিচারে হস্তক্ষেপ করবেন না, কিন্তু সাক্ষী হিসেবে তাঁর উপস্থিতি ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে একটি ‘Check and Balance’ হিসেবে কাজ করবে। এটি প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থাও বহুণ বাড়িয়ে দেবে এবং প্রকৃত জনকল্যাণ নিশ্চিত হবে।

আমরা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বাস করি যেখানে জনগণের ম্যান্ডেট এবং আইনের প্রয়োগ একে অপরের পরিপূরক হওয়া উচিত। আমলাতন্ত্রের প্রভুত্ব মনোভাব পরিহার করে স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। মোবাইল কোর্টকে কেবল দণ্ড দেওয়ার যন্ত্র না বানিয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করতে হবে। নীতিনির্ধারকদের উচিত দ্রুত আইনি সংস্কারের মাধ্যমে জনস্বার্থে এই ভারসাম্য নিশ্চিত করা। কারণ, জবাবদিহিতাহীন ক্ষমতা যেমন দুর্নীতির জন্ম দেয়, তেমনি ক্ষমতার সুষম বণ্টনই কেবল সাধারণ মানুষের মুক্তি ও অধিকার নিশ্চিত করতে পারে।

লেখক : কাজী মামুনুর রহমান মাহিম
সাংবাদিক, আইন ও নীতি বিশ্লেষক এবং সমাজকর্মী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর