ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই কঠিন রাজনৈতিক ও সামরিক হিসাব-নিকাশের মুখে পড়ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে ইরানের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হলেও, এর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক মূল্যও দ্রুত বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর সময় যে ঝুঁকিগুলোকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, এখন সেগুলোই বড় হয়ে সামনে আসছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা বৃদ্ধি, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়ছে।
যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল পরিবহন হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ এখন এই পথ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যেও প্রভাব পড়ছে।
যুদ্ধের ময়দানে ইতোমধ্যে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, সংঘাতে প্রায় ২,১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের বড় অংশই ইরানের নাগরিক। জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, নিহতদের মধ্যে অন্তত ১,৩০০ জন বেসামরিক মানুষ। এদিকে সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনার মৃত্যুর খবরও নিশ্চিত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। বর্তমানে ওই অঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। নতুন করে আরও প্রায় ২,৫০০ মেরিন সদস্য পাঠানোর প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপের কাছেও মার্কিন বাহিনী হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে।
সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর ঘটনায়। যদিও তার মৃত্যুর পরও দেশটির ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা টিকে রয়েছে এবং নতুন নেতৃত্ব সামনে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিকভাবে দুর্বল হলেও ইরান এখনও অসম যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করে পরিস্থিতি জটিল করে তুলতে পারে। সাইবার হামলা, সমুদ্রপথে মাইন পাতা বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মতো কৌশল ব্যবহার করে তারা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে।
যুদ্ধের আরেকটি বড় উদ্বেগ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, দেশটির কাছে এখনও প্রায় ৯৭০ পাউন্ড উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি পর্যায়ের উপাদান। এসব উপাদান গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় সংরক্ষিত থাকায় সেগুলো ধ্বংস বা উদ্ধার করা কঠিন।
এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক অভিযানে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের জন্য পরিস্থিতি সহজ নয়। নির্বাচনের সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন যুদ্ধে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তার রাজনৈতিক সমর্থকদের মধ্যেও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন দুটি পথ খোলা- যুদ্ধ আরও জোরদার করা অথবা ধীরে ধীরে কূটনৈতিক সমাধানের দিকে এগোনো। কোন পথ বেছে নেওয়া হবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।