সমাজে বৈবাহিক পবিত্রতা ও পারিবারিক কাঠামোর ভিত্তি ধ্বংসকারী ডিভোর্স জালিয়াতি বন্ধ এবং প্রকাশ্য পরকীয়া-ব্যভিচার রোধে ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও প্রতারক তামিমা সুলতানার চূড়ান্ত ও কঠিনতম দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজধানী।
আজ সোমবার (৮ জুন) সকাল ১১ টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে পুরুষ অধিকার নিয়ে কাজ করা সামাজিক সংগঠন ‘এইড ফর মেন ফাউন্ডেশন’-এর ব্যানারে আয়োজিত এক বিশাল মানববন্ধনে এই জোরালো দাবি জানানো হয়।
বক্তারা স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, পিবিআই-এর তদন্ত রিপোর্টে ও বাদীপক্ষ কতৃক বিজ্ঞ আদালতে অকাট্য সাক্ষ্য, প্রমাণ ও যুক্তিতর্কে পরিষ্কার জালিয়াতি ও ব্যভিচারের অকাট্য দালিলিক প্রমাণ থাকার পরও আগামী ১০ জুনের রায়ের আগে আসামিপক্ষের আইনজীবীর ‘নিশ্চিত খালাস পাওয়ার’ দাবি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, বিভ্রান্তিমূলক এবং বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা।
সংগঠনের কোষাধক্ষ্য আল আমিন হোসেইনের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে প্রধান বক্তা হিসেবে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম নাদিম ক্রিকেটার নাসির ও তামিমার অপরাধের ভয়াবহতা তুলে ধরে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, আজ আমরা এখানে এক বুক ক্ষোভ আর ন্যায়বিচারের দাবি নিয়ে দাঁড়িয়েছি। ক্রিকেটার নাসির এবং তামিমার মামলাটি সমাজকে অবক্ষয়ের কোন স্তরে নিয়ে গেছে তা আজ আর কারও অজানা নয়।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, পিবিআই-এর তদন্ত প্রতিবেদন ও বাদীপক্ষ কতৃক বিজ্ঞ আদালতে অকাট্য সাক্ষ্য, প্রমাণ ও যুক্তিতর্কে পরিষ্কার প্রমাণিত হয়েছে যে, তারা দুজনেই প্রথম বিবাহ আইনত বহাল রেখে ভুয়া নথিপত্র তৈরি ও ডাকবিভাগের রিসিট জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় বিশেষায়িত সংস্থার নিখুঁত তদন্তে ও বাদীপক্ষ কতৃক বিজ্ঞ আদালতে অকাট্য সাক্ষ্য, প্রমাণ ও যুক্তিতর্কে পরিষ্কার এই জঘন্য অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও আইনি মারপ্যাঁচে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকতে পারে না। রাষ্ট্র এবং বিজ্ঞ আদালতের কাছে আমাদের জোরালো দাবি—এই জালিয়াতি চক্রকে কঠিনতম শাস্তির আওতায় এনে সমাজে একটি কঠোর নজির স্থাপন করা হোক।”
তিনি আরও বলেন, “অপরাধী নারী হলেই সে রেহাই পাবে, আর পুরুষ হলেই অপরাধী—এই মানসিকতা বদলাতে হবে। রামিসা হত্যা মামলার মতো জঘন্য অপরাধেও নারীদের ফাঁসি কার্যকর না হওয়া এবং নারীদের ক্ষেত্রে লঘু শাস্তির যে সামাজিক প্রবণতা রয়েছে, নাসির-তামিমা মামলায় তার পুনরাবৃত্তি দেশের সাধারণ মানুষ মেনে নেবে না। অপরাধীকে কেবল অপরাধের ভিত্তিতেই সাজা দিতে হবে।”
মানববন্ধনে বক্তারা মামলার নথি ও বিজ্ঞ আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষীদের জবানবন্দি উল্লেখ করে অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন, “বিজ্ঞ আদালতে দাখিলকৃত সাক্ষীদের জবানবন্দি ও দালিলিক প্রমাণেই ক্রিকেটার নাসির ও তামিমার অপরাধ জালিয়াতির বিষয়টি দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। নথিতে দেখা যায়, আদালতে মামলার বাদী এবং অন্য সাক্ষীদের জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ৮ মার্চ তামিমা সৌদি আরবে যাওয়ার মাত্র দুই দিন আগেও তাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বৈধ সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। অথচ এই সম্পর্ক চলমান থাকা অবস্থাতেই ২০২১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তামিমা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে নাসিরকে বিয়ে করেন। হোটেল লা মেরিডিয়ানের ডিরেক্টর এবং সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৪ জুলাইও তামিমা সৌদি এয়ারলাইন্সের কেবিন ক্রু হিসেবে ওই হোটেলে এলে স্বামী রাকিব হাসান প্রসিডিউর মেনে তাঁর ১০১৭ নম্বর রুমে যান এবং তামিমার পাসপোর্টেও স্বামীর নাম ‘রাকিব হাসান’ হিসেবেই লিপিবদ্ধ ছিল। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন ও বর্তমান চেয়ারম্যানের বিজ্ঞ আদালতে দাখিলকৃত রেজিস্টার ও জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর তামিমা কর্তৃক তালাক প্রদানের যে দাবি করা হয়েছে, তার কোনো নোটিশ বা নথি ইউনিয়ন পরিষদে কখনোই গৃহীত বা নথিবদ্ধ হয়নি। ডেপুটি পোস্ট মাস্টার জেনারেলের দাপ্তরিক তদন্ত রিপোর্টে প্রমাণিত হয়েছে যে, তথাকথিত তালাক নোটিশের যে রেজিস্ট্রি পত্র নম্বর দেখানো হয়েছে, তা দিয়াবাড়ী বা নিশাত নগর উপ-ডাকঘর থেকে কখনোই ইস্যু করা হয়নি। বাড়িওয়ালা এবং নাসির-তামিমার নিজস্ব ১০ বছর বয়সী কন্যা সন্তানের জবানবন্দিতেও পরিষ্কার এসেছে যে, তারা সবসময়ই নিজেদের মা-বাবা হিসেবে সুখে-শান্তিতে একসাথে বসবাস করতে দেখেছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তাঁর জবানবন্দিতে স্পষ্ট করেছেন যে, বৈধ বৈবাহিক সম্পর্ক চলমান থাকা অবস্থায় ক্রিকেটার নাসির হোসেন কর্তৃক অন্যের স্ত্রীকে প্রলুব্ধ করে নিজের হেফাজতে রাখা, ব্যভিচার সৃষ্টি এবং প্রচারের উদ্দেশ্যে মিথ্যা প্রেস কনফারেন্স করার অপরাধ তদন্তে সম্পূর্ণ প্রমাণিত হয়েছে।”
মানববন্ধনে আসামিপক্ষের আইনজীবীর আগাম ও একপেশে প্রচারণার তীব্র সমালোচনা করে সংগঠনের দপ্তর সম্পাদক ইয়াসির আরাফাত বলেন, “নাসির ও তামিমার আইনজীবী ইতিমধ্যেই প্রকাশ্য গণমাধ্যমে দাবি করছেন যে আসামিরা শতভাগ খালাস পাবেন। বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই এবং আদালতে অপরাধের দালিলিক প্রমাণ হাজির থাকার পরও রায়ের আগে এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিমূলক। এটি প্রমাণ করে যে, সমাজে নারীদের অপরাধে লঘু শাস্তি দেওয়া বা জালিয়াতি করেও পার পেয়ে যাওয়ার যে আইনি ফাঁকফোকর রয়েছে, আসামিপক্ষ তার অবৈধ সুবিধা নেওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে বসে আছে। রায়ের আগে এই ধরনের বক্তব্য দেশের সাধারণ নাগরিকদের মনে চরম বিচারহীনতার আশঙ্কা তৈরি করছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।”
ঢাকা জেলা কমিটির সহ-সভাপতি ইফতেখার হোসেইন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আলমগীর চৌধুরী তাঁদের বক্তব্যে বলেন, দেশের বাইরে থাকা হাজারো প্রবাসী দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে দেশে টাকা পাঠান। অথচ আইনি ডিভোর্স না দিয়েই কিছু অসাধু নারী পরকীয়া ও জালিয়াতির মাধ্যমে সংসার ভেঙে প্রবাসীদের নিঃস্ব করছে। দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারার চরম সীমাবদ্ধতা ও আইনি শিথিলতার কারণে অপরাধী নারীরা পার পেয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে, যা দেশের ও প্রবাসী পুরুষদের প্রতি স্পষ্ট আইনি বৈষম্য।
বক্তারা সুনির্দিষ্টভাবে জোর দাবি জানান যে, আগামী ১০ জুনের রায়ে ক্রিকেটার নাসির এবং তামিমাকে জালিয়াতি ও ব্যভিচারের অপরাধে কঠোরতম কারাদণ্ড দিয়ে আদালত যেন প্রমাণ করেন যে—আইনের চোখে সবাই সমান এবং জালিয়াতি করে কেউ পার পেতে পারে না।
সামাজিক অবক্ষয় রোধে এবং লিঙ্গ বৈষম্যমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে ‘এইড ফর মেন ফাউন্ডেশন’ দেশের সর্বস্তরের সচেতন নাগরিক, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমকর্মীদের এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মানববন্ধন সমাপ্ত করে।